শিল্পী এস এম সুলতান: এক অনন্য প্রতিভার প্রতিচ্ছবি
বাংলাদেশের চিত্রকলা জগতের এক অনন্য নাম হল এস এম সুলতান। তাঁর তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের সজীব বাস্তবতা, কৃষকের কঠোর পরিশ্রম, প্রকৃতির নিবিড় সংস্পর্শ ও জীবনসংগ্রামের প্রতিচিত্র। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন এক দার্শনিকও, যাঁর শিল্পকর্ম বাংলার শিকড়কে গভীরভাবে ধারণ করে আছে।
শিল্পী শেখ মোহাম্মদ (এস এম) সুলতান ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট, নড়াইল জেলার মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে শিল্পের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়মিত না থাকলেও তিনি নিজ প্রচেষ্টায় চিত্রকলার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং একসময় ভারতবর্ষের প্রসিদ্ধ চিত্রকলার বিদ্যাপীঠ কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল না। তাই তিনি প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই বেরিয়ে পড়েন শিল্পের নতুন দিগন্ত খুঁজতে।
এস এম সুলতানের চিত্রকলা অন্যান্য শিল্পীদের তুলনায় ছিল ভিন্নধর্মী। তিনি কখনো পাশ্চাত্য চিত্রধারার অনুসরণ করেননি; বরং নিজের দেশীয় সংস্কৃতি ও গ্রামীণ বাংলার জীবনধারা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তাঁর চিত্রকর্ম গড়ে তোলেন। তাঁর ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে কৃষকদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, প্রকৃতির সাথে তাঁদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক, এবং গ্রামবাংলার শাশ্বত সৌন্দর্য।
১৯৫০-এর দশকে তিনি পশ্চিমা বিশ্বে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শন করেন। নিউইয়র্ক, লন্ডন, শিকাগোসহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁর চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়, যেখানে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
এস এম সুলতানের চিত্রশৈলীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর শক্তিশালী রঙের ব্যবহার এবং বিশালকায় কৃষক-কৃষাণীদের প্রতিচিত্র। তাঁর আঁকা কৃষকেরা ছিলেন শারীরিকভাবে বলিষ্ঠ ও মহাকাব্যিক রূপে উপস্থাপিত। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, কৃষকরাই প্রকৃত শক্তিমান; তাঁদের হাতেই সমাজের প্রকৃত বিকাশ ঘটে। তাঁর চিত্রকর্মে গরীব কৃষকরা শুধু সাধারণ গ্রাম্য মানুষ নয়, বরং তাঁরা একেকজন বীরের প্রতিচিত্র।
এস এম সুলতানের কিছু উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম হল:
১. কৃষক জীবন – যেখানে তিনি বাঙালি কৃষকের শক্তিশালী ও সংগ্রামী রূপ তুলে ধরেছেন।
২. মাঠের কাজ – কৃষকদের মাঠে কঠোর পরিশ্রম করার দৃশ্য ফুটে উঠেছে এই চিত্রে।
৩. শ্রমজীবী মানুষ – কৃষক ও মজুরদের পরিশ্রমী জীবন এবং তাঁদের সম্মানিত অবস্থান প্রকাশ করা হয়েছে এই চিত্রকর্মে।
৪. মহাকাব্যিক কৃষক – এখানে কৃষকদের বিশাল শরীর ও বলিষ্ঠ রূপের মাধ্যমে তাঁদের গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।
শিল্পী সুলতান ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তিনি অর্থ ও খ্যাতির প্রতি কখনোই আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর সময়ের অন্যান্য শিল্পীরা যখন রাজধানী ও বিদেশে নাম কামাচ্ছিলেন, তখন তিনি নড়াইলের মাটিতেই নিজেকে নিবেদন করেছিলেন। সেখানে তিনি শিশুদের জন্য আর্ট স্কুল গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা সহজেই চিত্রকলা শিখতে পারত।
তিনি মনে করতেন, শিল্প মানুষের মনের গভীরতম অনুভূতি ও অভিব্যক্তির প্রকাশ। তাই তাঁর চিত্রকর্মে কেবল সৌন্দর্য ছিল না, ছিল সমাজের বাস্তব চিত্র ও কৃষকদের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধ।
এস এম সুলতানের অনন্য প্রতিভা শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও স্বীকৃতি পেয়েছিল। তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:
- একুশে পদক (১৯৮২) – বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার।
- বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৪) – শিল্পকলা বিভাগে বিশেষ অবদানের জন্য।
- স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৩) – বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার।
- জাপান ও আমেরিকায় তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শনী – যেখানে তাঁর কাজ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
শিল্পী সুলতান জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নড়াইলেই কাটিয়েছেন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর, তিনি নড়াইলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারায় এক কিংবদন্তি চিত্রশিল্পীকে, যাঁর তুলির ছোঁয়ায় বাংলার চিত্রকলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থান পেয়েছিল।
শিল্পী এস এম সুলতান ছিলেন একজন সত্যিকারের বাংলার চিত্রকর। তাঁর চিত্রকর্ম শুধু শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করেছে। তিনি ছিলেন নিভৃতচারী এক শিল্পী, যিনি খ্যাতি বা সম্পদের পেছনে ছোটেননি, বরং নিজের শিকড়ের সঙ্গে অটুট ছিলেন। তাঁর শিল্প আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির গৌরবময় ইতিহাস ও সংগ্রামী কৃষক সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে চির অমলিন করে রেখেছে। এস এম সুলতান শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন, তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের চিরন্তন কণ্ঠস্বর, যাঁর সৃষ্টি আমাদের চিরকাল অনুপ্রেরণা জোগাবে।
শিল্পী এস এম সুলতান